আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ বিশ্বজুড়ে তিনশর বেশি সাংবাদিককে বরখাস্ত করেছে। জেফ বেজোসের কাছে সাংবাদিকদের অনুরোধেও এই ছাঁটাই রুখতে পারেনি।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) এক ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিউজরুমের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর জানায়, যার মধ্যে প্রায় পুরো স্পোর্টস ডেস্কও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ডেস্কের পাশাপাশি স্পোর্টস সেকশন মিলিয়ে পুরো নিউজরুমের ৩০০-র বেশি সাংবাদিককে ছাঁটাই করা হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, ৪৫ সদস্যের স্পোর্টস টিমের মাত্র হাতেগোনা কয়েকজনকে রাখা হয়েছে। তবে যারা আছেন তাদের প্রতিষ্ঠানের অন্য বিভাগে বদলি করা হবে।
সিএনএন-এর হাতে আসা একটি ইমেইল থেকে জানা যায়, বুধবার সকালে প্রতিষ্ঠানটির এক্সিকিউটিভ এডিটর ম্যাট মারে এবং এইচআর প্রধান ওয়েন কনেল কর্মীদের ‘আজ বাসায় থাকার’ এবং সাড়ে ৮টায় একটি জুম কলে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
মারে তার চিঠিতে এই সিদ্ধান্তকে যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে বর্ণনা করে লিখেন, ‘এই পদক্ষেপের ফলে আমাদের নিউজরুমের প্রায় প্রতিটি বিভাগ থেকে উল্লেখযোগ্য হারে কর্মী হ্রাস পাবে। আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, আমাদের কোম্পানির বর্তমান কাঠামোটি এমন এক প্রাচীন আমলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যখন আমরা মূলত একটি প্রভাবশালী স্থানীয় প্রিন্ট মিডিয়া ছিলাম।’
ওয়াশিংটন পোস্টের একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে, প্রতিষ্ঠানজুড়ে একটি বড় ধরনের পুনর্গঠন চলছে। এই ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের আবেগঘন বার্তার ঢল নামে।
ওয়াশিংটন পোস্টের জাতি ও বর্ণ বিষয়ক রিপোর্টার ইমানুয়েল ফেল্টন এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘আমিও সেই শত শত মানুষের মধ্যে একজন যাদেরকে পোস্ট থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ছয় মাস আগেই একটি সভায় আমাদের বলা হয়েছিল যে জাতিগত বিষয়ের প্রতিবেদনগুলোই বেশি সাবস্ক্রিপশন আনছে। এটি কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি ছিল আদর্শিক সিদ্ধান্ত।’
জেফ বেজোস প্রতিষ্ঠিত আমাজন নিয়ে কাজ করা বিট রিপোর্টার ক্যারোলিন ও ডোনোভানকেও ছাঁটাই করা হয়েছে। এমনকি বাদ পড়েননি যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত সাংবাদিকরাও।
ইউক্রেন যুদ্ধের রিপোর্টার লিজি জনসন লিখেছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে থাকা অবস্থায় আমাকে ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। আমি বাকরুদ্ধ এবং বিধ্বস্ত।’
বেশ কয়েকজন কর্মীর তথ্য অনুযায়ী, জেরুজালেম এবং ইউক্রেন ব্যুরো পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়াও জাতীয় সংস্কৃতি ও বিনোদন লেখক জাডা ইউয়ান, বইবিষয়ক সম্পাদক জ্যাকব ব্রোগান, টেক কলামিস্ট জিওফ ফাউলার এবং কায়রো ব্যুরো চিফ ক্লেয়ার পার্কারও তাদের ছাঁটাইয়ের খবর জানিয়েছেন।
এমনকি বিখ্যাত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি উন্মোচনকারী মেট্রো ডেস্কের অবস্থা এখন করুণ। এক সময়ের ৩৩ জন রিপোর্টার ও ১১ জন সম্পাদকের স্থলে এখন মাত্র ১৫ জন রিপোর্টার এবং ৩ জন সম্পাদক টিকে আছেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পিটার ফিন এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ার পরিকল্পনার অংশ হওয়ার চেয়ে নিজেই পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
ওয়াইট হাউস ব্যুরো চিফ ম্যাট ভাইজারসহ আটজন রিপোর্টার বেজোসকে লেখা চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে, পোস্টের সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিক, স্থানীয় ও স্পোর্টস ডেস্কের পারস্পরিক সহযোগিতা কতটা জরুরি।
সিএনএন জানায়, স্থানীয় বিট রিপোর্টার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরাও বেজোসকে ছাঁটাই বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন।
বেজোস এবং প্রকাশক উইল লুইসের ওপর কর্মীদের অনাস্থা আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল, বিশেষ করে ২০২৪ সালে কমলা হ্যারিসের প্রতি সমর্থন জানানো বন্ধ করা এবং মতামত বিভাগে রক্ষণশীল কণ্ঠস্বরের পর থেকে।
অন্যদিকে হ্যারিসকে সমর্থন না দেওয়ার সিদ্ধান্তে হাজার হাজার পাঠক সাবস্ক্রিপশন বাতিল করেন, যা পত্রিকার আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের স্বেচ্ছায় অবসরের প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে বুধবারের এই গণ-ছাঁটাই নির্দেশের পর সেই সুযোগ শেষ। এখন কঠোরভাবে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে প্রতিষ্ঠানটি। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
বিআর/
