ঢাকা অফিস:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে আংশিকভাবে বিতর্কমুক্ত বলা গেলেও পুরোপুরি প্রশ্নাতীত হয়নি বলে মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
পর্যবেক্ষক সংস্থাটির মতে, এবারের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলেও ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রার্থীর বিজয়, গণভোট-পরবর্তী শপথ জটিলতা এবং আইনি কাঠামোর ঘাটতিসহ নানা ইস্যুতে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিএনপি গণভোটের শপথ না নেওয়াসহ আইনি ও প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা ভবিষ্যতে এই নির্বাচন বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব তথ্য জানায়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সুজনের পর্যবেক্ষণের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংস্থার সদস্য একরাম হোসেন।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সুজনের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংস্থার সদস্য একরাম হোসেন। তিনি জানান, ৬৪ জেলার ৬৪টি আসন পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচনকে ৯টি মানদণ্ডে তারা মূল্যায়ন করেছে। সুজনের মতে, ভোটার তালিকা তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল, বড় ধরনের বিতর্ক দেখা যায়নি। অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় সব আসনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি। ভোটাররা ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছেন- এমন চিত্রই বেশি পাওয়া গেছে। তবে গণনা ও ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়নি বলে মন্তব্য করে সংস্থাটি। কিছু আসনে প্রভাব বিস্তার, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছে সুজন।
ভোটারদের বিষয়ে বলা হয়, অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কয়েকটি স্থানে সহিংসতা, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রশাসন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলেও কিছু অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভোটের দিন সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ স্বাভাবিক ছিল বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে সংস্থাটি। তবে গণভোটে কয়েকটি আসনে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব বড় প্রশ্ন
সংস্থাটির মতে, প্রায় দুই ডজন অভিযুক্ত ঋণখেলাপি প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং অন্তত ১১ জন বিজয়ী হয়েছেন। অনেকেই উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ প্রসঙ্গে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১(এফ) ধারা অনুযায়ী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য বা তথ্য গোপন প্রমাণিত হলে নির্বাচন কমিশন বিজয়ীদের আসন বাতিল করতে পারে।’
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কেবল ভোটের দিনের ঘটনা নয়, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আইনি কাঠামো দুর্বল হলে ভোট শান্তিপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকে যায়। দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপনের অভিযোগ নিয়েও তদন্তের আহ্বান জানান তিনি। সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সামনে এলে কমিশনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিলো দ্বি-দলীয়
সুজনের পর্যবেক্ষণে এবারের নির্বাচনের একটি বড় ‘আউটকাম’ হলো দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্থান। বিএনপি জোট ও জামায়াত জোট সম্মিলিতভাবে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট পেয়েছে এবং ২৮৯ আসনে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। অতীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিএনপি ও জামায়াতের শক্তি-সামর্থ্য ভারসাম্যপূর্ণ না হলেও সবাইকে অবাক করে দিয়ে জামায়াত জোট প্রায় সব আসনে বিএনপির সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পেরেছে। এটিকে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য ইতিবাচক নির্দেশক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
গণভোট ও শপথ জটিলতা
গণভোটে অনুমোদিত ৪৮টি সংস্কার বিষয় বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ প্রসঙ্গে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিএনপি সংসদ সদস্যরা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় একটি জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন বদিউল আলম মজুমদার। তার মতে, গণভোটে জনগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শপথ না নেওয়া পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। তবে ক্ষমতাসীন দল পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে- সেটি কার্যকর হয় কি না, তা দেখার বিষয়।
পর্যবেক্ষণে বিতর্কের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছে সুজন। সংস্থাটির মতে, যারা ভোট দিতে চেয়েছেন তারা ভোট দিতে পেরেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফল ঘোষণার পর বড় দলগুলোর ফল মেনে নেওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কাঠামোগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।
বিআর/
