ঢাকা অফিসঃ
জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এখন প্রশ্ন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন কে? সংবিধান অনুসারে জাতীয় সংসদের বিদায়ী স্পিকারই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান। আর স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার সেই দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু গত ৫ ফেব্রুয়ারি আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এখন আমাদের এখানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের মধ্যে একজন নিখোঁজ আর একজন জেলে আছেন। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর কিছু মামলা আছে এবং তারা পদত্যাগও করেছেন। বিশেষ করে স্পিকার। ফলে এই অবস্থায় ওনাদের দ্বারা শপথ গ্রহণ করানোর কোনো রকম সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।’
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা বর্তমানে শপথের অপেক্ষায় আছেন– এমন বাস্তবতায় গতকাল শুক্রবার খবরের কাগজের সঙ্গে কথা হয় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদের।
তিনি বলেন, ‘স্পিকার নিখোঁজ হলে তাকে সরকার কবে, কোথায়, কীভাবে খুঁজেছে, এটা তো সরকার কখনো জনগণকে কিছু জানায়নি!’
স্পিকারের ‘পদত্যাগ’ প্রশ্নে আইনজীবী বলেন, ‘সংবিধান অনুসারে স্পিকার পদত্যাগ করলেও পরবর্তী স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনিই দায়িত্বে আছেন। এটা সংবিধান স্বীকৃত।’
ডেপুটি স্পিকার জেলে থাকা প্রশ্নে আইনজীবী বলেন, ‘ডেপুটি স্পিকার যদি নিজ থেকে শপথ পড়াতে না চান, সেটি ভিন্ন কথা। কিন্তু শপথ পড়াতে যদি উনি রাজি থাকেন, তাহলে তো প্যারোলে মুক্তি দিয়েই তাকে দিয়ে শপথ পড়ানো যাবে।’
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদও সম্প্রতি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। সংবিধানের ১৪৮-এর ৩ ধারা থেকে তিনি বলেছেন, ‘শপথ স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকার যদি না পড়ান, বা তারা পড়াতে অসমর্থ হন বা না থাকেন, তাহলে তিন দিন পরেও চতুর্থ দিন থেকে পরবর্তী দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারই শপথ পাঠ করাবেন।’
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, তারা ‘যদি না পড়ান’–কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উনারা পড়াতে চাননি–এমন বাস্তবতা সামনে এলে, পরের অপশনে যাওয়া যাবে। অন্যথায় এই নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে আদালতে।
তারা পড়াতে অসমর্থ বা ডেপুটি স্পিকার কারাগারে–বিষয়গুলোতে মনোযোগ আকর্ষণ করা হলে এই আইনজীবী বলেন, ‘স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার তো কোনো মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত নন, তাদের নামে মামলা থাকলেই তারা শপথ পড়াতে অসমর্থ হবেন, এটা ভাবার আইনি ভিত্তি নেই।’
আইনজীবী বলেন, ‘স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে দিয়ে শপথ না পড়িয়ে পরবর্তী বিকল্পে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। যৌক্তিক কারণ না থাকলে ভবিষ্যতে এই শপথই আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাই তেমন সুযোগ রাখা উচিত হবে না।’
পরের বিকল্পে যাওয়ার আগেও আইনি সতর্কতার কথা মনে করিয়ে দেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘‘শেষ পর্যন্ত যদি স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে দিয়ে শপথ পড়ানো না হয়, তাহলে প্রধান বিচারপতি ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কথা এসেছে। সেখানেও ‘গুরুত্বের ক্রম’ ভাবতে হবে যথাযথভাবে।’’
গুরুত্বের ক্রম প্রশ্নে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি শপথ নেন রাষ্ট্রপতির কাছে। আর সিইসি শপথ নেন প্রধান বিচারপতির কাছে। তার মানে এখানে প্রধান বিচারপতি প্রথম গ্রেডের হলে, সিইসি হবে দ্বিতীয় গ্রেডের। রাষ্ট্রপতিও কাউকে মনোনীত করার ক্ষেত্রে এই গ্রেডের কথা স্বাভাবিক ভাবেই ভাবার কথা। এর ক্রম এড়ালেও শপথ আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।’
গত ৫ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শপথসংক্রান্ত আইন-কানুন তুলে ধরেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। ওইদিন তিনি বলেন, ‘আমাদের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, নতুন যারা সংসদ সদস্য হবেন ইনশাআল্লাহ, তাদের শপথ গ্রহণ করার কথা রয়েছে স্পিকারের কাছে। স্পিকার না থাকলে ডেপুটি স্পিকারের কাছে। ওনারা না থাকলে অন্য বিধানও আছে।’
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। ওই বছর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলার আসামি হন তিনি। এরপর থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না।
ওই সংসদে ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব নেন শামসুল হক টুকু। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনিও এখন মামলার আসামি হয়ে কারাগারে রয়েছেন। এই বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন, এই নিয়ে আইন-আদালত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানামুখী আলোচনা।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি এ প্রসঙ্গে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ‘আমাদের আইনে আছে, উনারা যদি শপথ পড়াতে না পারেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত, অর্থাৎ প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাবেন।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘তিন দিনের মধ্যে যদি এই শপথটা না হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও শপথ গ্রহণ করাতে পারবেন। এখন এটা সরকারি নীতিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। আমি আপনাদের চূড়ান্ত কিছু বলতে পারব না। তবে আমাদের সামনে দুইটা অপশনই আছে। একটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাতে পারেন।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘যেমন হয়তো আমাদের প্রধান বিচারপতি হতে পারেন। আর যদি এটা না হয়, তাহলে আমাদের যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আছেন, উনি শপথ গ্রহণ করাবেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে একটা সমস্যা হচ্ছে, তিন দিন ওয়েট করতে হবে। আমরা আসলে ওয়েট করতে চাই না। আমরা নির্বাচন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব, শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই।’
বিআর/
