ক্রীড়া প্রতিবেদক:
বিশ্বকাপের কিছু রাত কেবল একটি নামের জন্যই মনে থাকে। ডালাসের এই রাতটি তেমনই—লিওনেল মেসির রাত।
শুরুটা হয়েছিল হতাশায়, শেষটা ইতিহাসে। পেনাল্টি মিস দিয়ে ম্যাচ শুরু করেও পরে জোড়া গোলে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে এলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তার দুর্দান্ত নৈপুণ্যে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নিয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার হাতে। দ্বিতীয় মিনিটে এনসো ফার্নান্দেসের শট সাইড নেটে লাগলেও বুঝিয়ে দেয়, আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়েই মাঠে নেমেছে স্কালোনির দল। চার মিনিটের মাথায় লাউতারো মার্তিনেসকে বক্সে ফাউল করলে ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টির নির্দেশ দেন রেফারি।
পুরো স্টেডিয়াম তখন অপেক্ষায় ছিল ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার। কিন্তু নবম মিনিটে স্পট-কিক নিতে গিয়ে ডান পোস্টের বাইরে বল পাঠিয়ে দেন মেসি। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় গ্যালারি। অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন জেগেছিল—আজও কি অপেক্ষা বাড়বে?
কিন্তু মেসি তো বারবার প্রমাণ করেছেন, একটি ভুল তার গল্পের শেষ নয়; বরং সেটিই হয়ে ওঠে নতুন শুরুর অধ্যায়।
পেনাল্টি মিসের পর আরও ছন্দে খেলে আর্জেন্টিনা। একের পর এক আক্রমণে চাপে পড়ে অস্ট্রিয়ার রক্ষণ। ২৩ মিনিটে মার্সেল সাবিৎসারের শট রোমেরোর গায়ে লেগে কর্নার হয়। ৩২ মিনিটে প্রায় নিশ্চিত গোল থেকে মেসিকে বঞ্চিত করেন কেভিন ডানসো।
অবশেষে ৩৮ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। বাঁ দিক থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে দুর্দান্ত নিচু শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন মেসি। বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে ডালাস। সেই গোলেই বিশ্বকাপে নিজের ১৭তম গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে যান তিনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট এখন মেসির মাথায়। একই সঙ্গে টানা ছয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন তিনি।
এক গোলের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
বিরতির পর অস্ট্রিয়া কিছুটা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তবে আর্জেন্টিনার সুসংগঠিত রক্ষণ তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। ৫৬ মিনিটে সাবিৎসারের ফ্রি-কিক দুর্দান্তভাবে ফিরিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস।
৫৯ মিনিটে চোটের কারণে মাঠ ছাড়েন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। তার জায়গায় নামেন অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দি। এরপর হুলিয়ান আলভারেস, নিকোলাস গনসালেস, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে নামিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। অস্ট্রিয়াও একাধিক পরিবর্তন আনলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে ফাটল ধরাতে পারেনি।
যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে প্যাট্রিক ভিমারের হেড অল্পের জন্য বাইরে চলে গেলে শেষ আশাটুকুও নিভে যায় অস্ট্রিয়ার।
এর ঠিক এক মিনিট পর আবারও হাজির হন মেসি। হুলিয়ান আলভারেসের শট গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দিলেও ফিরতি বলে প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তবে দ্বিতীয়বার আর ভুল করেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ডানসোকে কাটিয়ে ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে জোড়া গোল পূর্ণ করেন তিনি।
এই বিশ্বকাপে এটি মেসির পঞ্চম গোল, আর বিশ্বকাপে মোট গোলসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮-তে। শেষ দিকে একটি ফ্রি-কিক থেকেও হ্যাটট্রিকের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি, তবে বল অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
শেষ বাঁশি বাজতেই উৎসবে মেতে ওঠে আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয় জয় নিশ্চিত করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা জায়গা করে নেয় শেষ ৩২-এ। আর ডালাসের রাতটি ইতিহাসে থেকে যায় এক মানুষের নামে লিওনেল মেসি। যে রাতে একটি পেনাল্টি মিসও থামাতে পারেনি একজন কিংবদন্তিকে; বরং সেটিই হয়ে উঠেছিল ইতিহাস লেখার ভূমিকা।
