৩৯-এও ইতিহাসের নায়ক

মেসির গল্পের শেষ অধ্যায় এখনও বাকি

by Desh Sarakkhon
০ comments

ক্রীড়া প্রতিবেদক:

কিংবদন্তিদের গল্প কখনো একটি ট্রফি, একটি রেকর্ড কিংবা একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে আটকে থাকে না।

সময় যত এগোয়, তাদের গল্পও তত সমৃদ্ধ হয়। ফুটবল ইতিহাসে এমন খেলোয়াড় খুব কমই এসেছেন, যাদের প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি গোল, প্রতিটি ম্যাচ নতুন করে ইতিহাস লেখে। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি সেই বিরলদের একজন।

৩৯ বছরে পা রেখেও তিনি শুধু নিজের অতীতের গৌরবকে বয়ে বেড়াচ্ছেন না, বরং ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে লিখে চলেছেন নতুন নতুন অধ্যায়। তাই মেসির জন্মদিন মানে শুধু একটি বয়সের হিসাব নয়; এটি এমন এক কিংবদন্তির উদযাপন, যার গল্পের শেষ অধ্যায় এখনও লেখা হয়নি।

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য গল্পগুলোর একটি শুরু হয়েছিল ছোট্ট একটি ন্যাপকিন কাগজ দিয়ে। আর্জেন্টিনার রোজারিও থেকে আসা এক লাজুক, স্থূলকায় কিশোরের অসাধারণ প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বার্সেলোনা সেই ন্যাপকিনেই লিখেছিল চুক্তির প্রতিশ্রুতি। তখন হয়তো কেউ ভাবতেও পারেনি, সেই ছোট্ট কাগজই একদিন বিশ্বের সেরা ফুটবলারের জন্মকাহিনীর সাক্ষী হয়ে থাকবে।

সেই কিশোর লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া থেকে উঠে এসে তিনি বদলে দিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস। কাতালান ক্লাবটির হয়ে জিতেছেন অসংখ্য শিরোপা, গড়েছেন অগণিত রেকর্ড এবং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করে রেখেছেন কোটি কোটি ভক্তকে। একটি ন্যাপকিনে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ পৌঁছে গেছে ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের আসনে।

২৪ জুন ১৯৮৭ সালে জন্ম নেওয়া মেসি আজ ৩৯ বছরে পা রেখেছেন। অনেক ফুটবলারের জন্য এই বয়স বিদায়ের অপেক্ষা, স্মৃতিচারণের সময়। কিন্তু মেসির জন্য এই বয়স এখনও নতুন অধ্যায় লেখার সময়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি যেন আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছেন—জাদুকরের জাদু এখনও শেষ হয়নি।

বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ঝড় তুলেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। দুটি ম্যাচে তার নামের পাশে যোগ হয়েছে পাঁচ গোল। বিশেষ করে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন এমন এক উচ্চতা, যেখানে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে আগে কেউ পৌঁছাতে পারেননি। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন মেসি। জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৭ গোলের রেকর্ড ভেঙে ১৮ গোল নিয়ে এককভাবে শীর্ষে অবস্থান করছেন তিনি।

২০০৬ সালে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া এক কিশোর থেকে ২০২৬ সালে রেকর্ডের চূড়ায় ওঠা এক কিংবদন্তি মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা যেন একটি পূর্ণাঙ্গ মহাকাব্য। তবে এই গল্প শুধু পরিসংখ্যানের নয়; এটি সংগ্রাম, অপেক্ষা আর স্বপ্নপূরণের গল্পও।

ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনের সমস্যার কারণে অনিশ্চয়তায় পড়ে গিয়েছিল তার ফুটবল ক্যারিয়ার। সেই সময়ই তাকে আশ্রয় দেয় বার্সেলোনা। স্পেনের বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে বেড়ে ওঠেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় বিশ্ব ফুটবল জয়ের অভিযান।
বার্সেলোনার জার্সিতে মেসি হয়ে ওঠেন এক অনন্য অধ্যায়। ১৭ বছর বয়সে প্রথম দলের হয়ে অভিষেকের পর একের পর এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন তিনি। ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া, চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, অসংখ্য লা লিগা শিরোপা এবং ব্যক্তিগত অগণিত রেকর্ড নু ক্যাম্পে প্রায় দুই দশক ধরে তিনি গড়ে তুলেছেন এক স্বর্ণযুগ।

মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ জয়। ২০০৬ সালে স্বপ্নের শুরু, ২০১৪ সালে ফাইনালে গিয়ে হৃদয়ভাঙা হার, ২০১৮ সালে হতাশা সবকিছুর পর ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করছিল একটি পরিপূর্ণ সমাপ্তির।

সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ সালে। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা জেতে বিশ্বকাপ। ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতাও পূরণ করেন মেসি। সেই রাতের পর পেলে ও দিয়েগো ম্যারাডোনার পাশে সর্বকালের সেরার আলোচনায় তার অবস্থান আরও দৃঢ় হয়ে যায়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বকাপ জয়ের পরও তার ক্ষুধা কমেনি। অনেকেই ভেবেছিলেন কাতারেই শেষ হয়ে গেছে বিশ্বকাপের মেসি অধ্যায়। অথচ চার বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে এসে তিনি শুধু খেলছেন না, নতুন রেকর্ডও গড়ছেন।

ফুটবলের ইতিহাসে অনেক মহান খেলোয়াড় এসেছেন, অনেকেই কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। কিন্তু খুব কম ফুটবলারই একটি যুগের সংজ্ঞা হয়ে উঠতে পেরেছেন, যেভাবে হয়েছেন মেসি। তার ড্রিবল, তার বাম পায়ের ছোঁয়া, তার নিখুঁত পাস কিংবা অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, একটি অনুভূতির নাম।
৩৯তম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে মেসি হয়তো ক্যারিয়ারের শেষ বাঁকের দিকে হাঁটছেন। কিন্তু তার গল্পের শেষ অধ্যায় এখনও লেখা হয়নি। তিনি বহু আগেই নিজের নামকে একজন ফুটবলারের সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে এক কিংবদন্তিতে পরিণত করেছেন।

একদিন হয়তো তিনি বুটজোড়া তুলে রাখবেন। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাবে। ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনিতে মুখর গ্যালারিও একসময় নিশ্চুপ হয়ে যাবে। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের পাতায়, কোটি মানুষের স্মৃতিতে এবং প্রতিটি শিশুর স্বপ্নে একটি নাম চিরকাল ফিরে আসবে—লিওনেল মেসি।

You may also like

Leave a Comment