হিমেল ধর:
আজ শুক্রবার, ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। নিয়ম অনুযায়ী আজ সকল শ্রমিকের ছুটি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন; অনেকেই আজও কাজ করে চলেছেন, জীবনের প্রয়োজনে থেমে থাকার সুযোগ নেই তাদের।
ইদ্রিস মিয়া নামে ষাটোর্ধ বৃদ্ধ সকাল থেকে নন্দনকাননের একটি নির্মণাধীন ভবনের ইট ভাঙার কাজ করে যাচ্ছেন। তখন কথায় কথায় জানতে চাইলাম আজ তো মে দিবস। সরকারি বন্ধ, আপনি যে কাজ করতে এলেন? মে দিবস কথাটা শুনে চোখ তুলে তাকায় ইদ্রিস, কিছুটা বিস্মিত, কিছুটা বিরক্ত। তিনি বলেন, গরিবর আবার মে দিবস, এটা কী ? কিয়ুর মে দিবস ? আরার আর মে দিবস কী? আমরা কাম গরি, ভাত খাই। পত্যদিন কম বেশি কাম গরন পড়ে, কিন্তু পেডত পত্যদিন ভাত না পরে। পুরাদিন কাম গরলি ৫০০ টেয়া, পুরা দিন কাম ন গরলি ২০০-৩০০ টেয়া পাই। আর কাজ-কাম না থাকলে না খাইয়া শুয় থাকি।
শুক্রবার (১ মে) সকালে নগরের নন্দনকাননের একটি নির্মণাধীন ভবনের ইট ভাঙার কাজ করার সময় ঘামে ভেজা শরীরে চিকচিক করছিল লবণের সাদা দানা। মে দিবস আসে, মে দিবস যায়। অন্তঃত ৩০ বছর ধরে এই কাজ করা ইদ্রিস মিয়ার জীবনে কী দিনটির বিশেষ কোনো তাৎপর্য আছে?
ইদ্রিস মিয়ার মতো শ্রমজীবীদের জীবনে আসলেই কী মে দিবস প্রতিদিনের চেয়ে আলাদা বিশেষ কোনো দিন? দিনটিতে শ্রমিক সংগঠনগুলো মিছিল করে, লাল পতাকার শোভাযাত্রা হয়, গান-নাচ-আবৃত্তি হয়, ঝাঁঝালো কণ্ঠে বক্তব্য দেন শ্রমিক নেতারা। শ্রমিকদের জীবনে এসব আনুষ্ঠানিকতার কী কোনো প্রভাব আছে?
সেখানে ইট ভাঙার কাজ করেছেন আছিয়া বেগম। ডিসি রোড থেকে প্রতিদিন এখানে আসে কাজ করতে। আছিয়াকে যখন মে দিবসের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তখন তিনি উত্তর দেন, এই দিবস তাদের মতো দিনমজুরের জন্য না। বরং একদিন কাজ না করলে সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে।
সকালে জামালখান এলাকায় ফুটপাতের নালা নতুন করে মেরামত করেছেন আজাদ আলী। কথা হয় তার সাথে। সেখানকার তিনি বলেন, মে দিবস কাজ না করলে কেউ কী টাকা দেবে? পেটে ভাত যাবে কীভাবে?
তিনি জানান, যে টাকা মজুরি পাই তা দিয়ে সংসারের খরচ জোড়াতালি দিয়ে চলে। কষ্ট হয় তারপরেও কাজ করি। আর সরকারি ছুটি থাকায় পুরো দিন কাজের সুযোগ পেয়েছি। পরে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে তিনি বলেন, গরীব মানুষের আবার মে দিবস!
মহান মে দিবস উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি সব অফিস-আদালত, কলকারখানা ছুটি। আর দিনমজুর নারী-পুরুষ নিম্ন আয়ের এ শ্রমিকরা প্রতি দিনের মতো মহান মে দিবসও শ্রম বিক্রির জন্য জড়ো হয়েছে উন্মুক্ত আকাশের নিচে। তাদের কেউ মে দিবস সম্পর্কে জানেন, আবার অনেকে কিছুই জানেন না।
তাদের দেখলে মনে পরে যায় কাজী নজরুল ইসলামের কুলি মজুর কবিতার সেই একটি লাইন দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলো নীচে ফেলে! চোখ ফেটে এল জল, এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে…………..
প্রত্যেক বছর মহান মে দিবস আসে যায়। গোটা বিশ্বের মতো জমকালো ও যথাযথ মর্যাদায় বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। কিন্তু যাদের জন্য এতো আয়োজন তাদের কী কিছু আসে যায়। অধিকার আদায়ে দিবসটি কী তাদের জন্য আজও কার্যকর তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না।
ডিএস/ বিআর
