চট্টগ্রামে একইদিন আলোচিত দুই মামলার রায়, একজনের মৃত্যুদণ্ড অন্যজনের যাবজ্জীবন

by Desh Sarakkhon
০ comments

কে এম রাজীব : চট্টগ্রামে বহুল আলোচিত ইপিজেড এলাকায় শিশু আলিনা ইসলাম আয়াত অপহরণ ও হত্যা মামলা আর বাকলিয়া এলাকার আলোচিত ঘটনা চার বছর বয়সী শিশু ধর্ষণ মামলার রায় সহ দুই মামলার রায় দুই আদালতে প্রদান করা হয়েছে। বুধবার ( ১৭ জুন) দুপুরে দুই আদালতে এ দুই মামলার রায় প্রদান করা হয়। বহুল আলোচিত ইপিজেড এলাকায় শিশু আলিনা ইসলাম আয়াত অপহরণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি মো. আবিরকে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দেন চট্টগ্রাম মহানগরের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ষষ্ঠ আদালত, চট্টগ্রাম এর বিচারক মুহাম্মদ আলী আক্কাস। অপরদিকে বাকলিয়া এলাকায় আলোচিত ঘটনা চার বছর বয়সী শিশু ধর্ষণ মামলায় মনির হোসেন ( ৩০) নামের এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সাজা এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন, চট্টগ্রাম মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল এর বিচারক, সৈয়দা হাফসা ঝুমা।

 

মামলার তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, নগরের ইপিজেড থানাধীন নয়ারহাট ওয়াছমুন্সী বাড়ি এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আলিনা ইসলাম আয়াত ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে বাসার পাশের মক্তবে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে, পরিবারের পরিচিত ও প্রতিবেশী মো. আবির আলী মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে আয়াতকে অপহরণ করেছিলেন। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে তিনি শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

 

এরপর লাশ খণ্ড-বিখণ্ড করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেন। গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন।
তদন্ত চলাকালে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বটি, আয়াতের জুতা এবং বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করে। পরবর্তীতে আবিরের বাসা থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনার ডিএনএ পরীক্ষায় তা আয়াতের ডিএনএ’র সঙ্গে মিলে যায়। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর আউটার রিং রোডের আকমল আলী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে আয়াতের দুই পা এবং পরদিন খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করা হয়। তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের অক্টোবরে পিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

 

এসময় সাংবাদিকদের রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি জালাল উদ্দিন বলেন, মামলায় ৩৩ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন- ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর, নৃশংস ও সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, উদ্ধারকৃত আলামত এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। নিহত আয়াতের বাবা সোহেল রানা বলেন, ‘আমার মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আদালতের রায়ে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি’। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কিশোরের বিরুদ্ধে শিশু আদালতে পৃথক বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

 

অপরদিকে বাকলিয়ায় আলোচিত চার বছরের শিশু ধর্ষণ মামলায় আসামি মনির হোসেন ( ৩০) নামের এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল এর বিচারক, সৈয়দা হাফসা ঝুমা।

 

এসময় সাংবাদিকদের রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি মাহমুদু-উল আলম চৌধুরী ( মারুফ) জানান, ঘটনার পর আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পাশাপাশি ভুক্তভোগী শিশুটির জবানবন্দিও রেকর্ড করা হয়। পরে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ডিএনএ প্রতিবেদনসহ তদন্ত সম্পন্ন করে ৪ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।

 

মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় ৯ জুন। ওইদিন আসামির উপস্থিতিতে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দা হাফসা ঝুমা। পরদিন ১০ জুন থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে বাদী, ভুক্তভোগী, চিকিৎসকসহ মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়। ১৬ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ১৭ জুন এ রায় প্রদান করেন।

 

আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ২১ মে বিকেলে বাকলিয়া থানার নূর হোসেন চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার বালুর মাঠ সংলগ্ন একটি গুদামকক্ষে এ ঘটনা ঘটলে ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযুক্ত মনির হোসেনকে আটক করার পর উত্তেজিত জনতা তাকে গণপিটুনি দেওয়ার জন্য নিজেদের জিম্মায় নেওয়ার দাবি জানায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে জনতার দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সংঘর্ষে প্রায় ৩০ জন পুলিশ সদস্য সাংবাদিক সহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। পরে রাত সোয়া ১০টার দিকে পুলিশ কৌশলে আসামিকে নিজেদের হেফাজতে নিতে সক্ষম হয়। ঘটনার পরদিন ২২ মে ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা বাদী হয়ে মনির হোসেনকে একমাত্র আসামি করে বাকলিয়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।

You may also like

Leave a Comment