দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ৬১টি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, অথচ বাস্তবতা বিবেচনায় ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট। ব্যাংকের সংখ্যা কমানো গেলে সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে। এ লক্ষ্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে দুটি রেখে বাকিগুলো একীভূত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘ব্যাংকিং খাত: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক লোকবক্তৃতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম।
গভর্নর বলেন, দুর্বৃত্তায়ন, অনিয়ম, পরিবারতন্ত্র এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যার বড় একটি অংশ পাচার হয়ে থাকতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো একীভূত করার বিষয়ে সরকারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত যেন কোনোভাবেই ব্যাংকিং খাতে প্রভাব ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সঠিক গভর্ন্যান্সের অভাবেই এই খাত আজ সংকটে পড়েছে। ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের বহু ক্ষেত্র রয়েছে এবং সব দিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে সংস্কার কার্যক্রম চালাতে হবে।
আগামী মার্চের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন গভর্নর। তবে সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ জারি না হলে ভবিষ্যতে আবারও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ‘ব্যাংক রেজ্যুলিউশন ফান্ড’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এই কাঠামোর আওতায় শুধু ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আনা হবে।
ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে গভর্নর বলেন, নগদ লেনদেন রাজস্ব ফাঁকির অন্যতম প্রধান উৎস। ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব। এ জন্য শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, প্রায় বিপর্যস্ত একটি খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে বর্তমান গভর্নরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হলেও বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরিফ মোশারফ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কমেছে, ফলে বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতকে আরও কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন।
