নিজস্ব প্রতিবেদক : লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে রেশমি নামের ১২ বছর বয়সী এক শিশু কন্যা। চোখের নিচ দিয়ে ঢুকে যাওয়া গুলি তার মস্তিষ্কের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পাশে কান্নায় ভেঙে পড়া পরিবার। কোনো প্রটোকল ছাড়াই সেখানে উপস্থিত হন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
শুক্রবার ( ৮ মে) চট্টগ্রামের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম এর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক।
এসময় আইসিইউতে থাকা শিশুটির শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন তিনি। চিকিৎসকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন এবং নিজে হাতে রেশমার সিটি স্ক্যান রিপোর্টও দেখেন। চিকিৎসকেরা তাকে জানান, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। গুলিটি চোখের ভেতর দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে মারাত্মক ক্ষতি করেছে। এসময় কথাগুলো শুনে দৃশ্যত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেলা প্রশাসক।রেশমির মায়ের কান্না শুনে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন জেলা প্রশাসক। পরে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং তাদের আর্থিক সংকটের বিষয়টি জানতে পেরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিশুটির চিকিৎসায় যেন কোনো ধরনের অবহেলা না হয়। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান।
জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, একজন নিরীহ শিশুর এভাবে সন্ত্রাসের শিকার হওয়া অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এই ঘটনা মানবিকভাবে আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই আমি নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছি। এটি অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।”
চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যেভাবে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধীদের বিতাড়িত করে একসময়কার অপরাধের অভয়ারণ্যকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, ঠিক একইভাবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রেশমির পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথাও তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক বলেন, শিশুটির বাবা মো. রিয়াজ আহমেদ একজন প্রতিবন্ধী ও অত্যন্ত অসহায় মানুষ। পান বিক্রি করে তিনি পাঁচ সন্তানের সংসার চালান। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
পরবর্তীতে শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি জানামাত্র জেলা প্রশাসক নিজেই ফোন করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীনকে। তিনি অনুরোধ জানান, শিশুটিকে দ্রুত আইসিইউতে ভর্তি করে জরুরি অপারেশনের ব্যবস্থা করতে। একই সঙ্গে রেশমির ভাই মো. এজাজ হোসেনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সে থাকায় ফোন রিসিভ করতে না পারেননি। পরে জেলা প্রশাসকের স্টাফ অফিসার তাকে ফোন করে জানান, ডিসি ইতিমধ্যেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং রেশমার চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, জেলা প্রশাসক নিজেও হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য। তিনি বিভিন্ন সময় দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের জন্য ফোন করে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসার অনুরোধ করেন। আজও রেশমির সুচিকিৎসার জন্য ফোন করেছেন। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিশুটির চিকিৎসা করব।
এ দিকে রেশমির ভাই মো. এজাজ হোসেন বলেন, একজন জেলা প্রশাসক ছুটির দিনেও আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরাসরি হাসপাতালে এসেছেন। শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি, পরে আবার ফোন করে চিকিৎসার খোঁজ নিয়েছেন। তিনি সত্যিই একজন মানবিক জেলা প্রশাসক।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানাধীন রৌফাবাদ শহীদ মিনার গলি এলাকায় রাত আনুমানিক পৌনে ১০ টায় ৫/৬ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী হাসান ওরফে রাজু নামের এক যুবককে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে হাসান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আর সেই গোলাগুলির শিকার হয় পথচারী শিশু কন্যা রেশমি আক্তার। পরিবার সূত্রে জানা যায় জানা যায় , সেদিন রেশমিকে দোকানে পাঠিয়েছিলেন তার মা পান আনতে। বাসায় ফেরার পথে কলোনির গলিতে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে রেশমি। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি গুলি তার চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার ভেতরে আটকে গেছে। এতে মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লেগেছে। রেশমি
প্রসঙ্গত, পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট। সে স্থানীয় ব্যারিস্টার মিল্কি মেমোরিয়াল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
ডিএস/ বিআর
